
করোনা-আবহে বাংলার সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের এখন মূল অভিযোগ রেশন ব্যবস্থা নিয়ে৷ বিরোধী- অভিযোগের সুরেই সুর মিলিয়েছেন রাজ্যের রাজ্যপাল, দিল্লিও৷
বিরোধীরা অভিযোগ তুলছে মানেই বিষয়টি মিথ্যা বা প্ররোচনামূলক, প্রশাসন এখনও এমন ভাবলে তা হবে হারিকিরি’র সমতুল৷
কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে জেলায় জেলায় রেশন নিয়ে সাধারণ মানুষের আর্তি৷ ইদানিং ‘বড়’ মিডিয়া কোনও ‘বড়’ কারনে বেশ কিছু খবরে হাত লাগাচ্ছে না৷ জাদুসম্রাট পি সি সরকারও হার মেনেছে এ ধরনের ‘ভ্যানিশ’ করার টেকনিকে৷ কিন্তু এত করেও জেলায় জেলায় রেশন নিয়ে অভিযোগ, রেশনে সরবরাহ করা খাদ্রসামগ্রীর মান নিয়ে অভিযোগ ঠেকানো যাচ্ছে না৷ কারন, মেইন স্ট্রিম মিডিয়া ক্রমশই ‘বিশেষভাবে সক্ষম’ একটি মাধ্যমে পরিনত হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার দাপটে৷ তারা কোন খবর চেপে দিলো অথবা কোন খবর বাড়াবাড়িস্তরে নিয়ে গিয়ে ডিসপ্লে করলো, সাধারন মানুষ এখন আর সে সব ধর্তব্যের মধ্যেই আনেনা৷ সোশ্যাল মিডিয়া এখন এতটাই শক্তিশালী যে মেইন-স্ট্রিম মিডিয়ার খবর চাপা বা খবর খাওয়ানোর মরিয়া চেষ্টা এখন “স্ট্যাণ্ড- আপ কমেডি”-র স্তরে পৌঁছে গিয়েছে৷
সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখলেই ধরা পড়ছে, রাজ্যের জেলায় জেলায় সরকারি রেশন নিয়ে অভিযোগ আছে৷ অনেক এলাকায় এই অভিযোগ বিক্ষোভের চেহারা নিয়েছে৷ কাক যখন নিজের খাবার লুকিয়ে রাখে, তখন তার চোখ থাকে বন্ধ৷ সম্ভবত কাকদের ব্যাখ্যা, ‘আমি যখন দেখলাম না আমার খাবার কোথায় লুকিয়েছি, তখন গোটা দুনিয়া তা দেখেনি৷’ মূলত এই লজিককে সামনে রেখেই রাজ্যের একশ্রেণির মিডিয়া ‘দায়িত্ব পালন’ করছে৷ এবং লোক হাসাচ্ছে৷ করোনা এবং লকডাউনের জেরে রাজ্যের স্বাভাবিক জনজীবন যখন বিপর্যস্ত, তখন রাজ্যের চারধারে সব কিছু ঠিক আছে, এমন হতে পারেনা৷ অথচ চেষ্টা তেমনই চলছে৷
রাজ্যের রেশন ব্যবস্থা তথা সরবরাহে যে বিস্তর গলদ আছে, বেশ কিছুদিন আগে রাজ্য প্রশাসনই সরাসরি তা মেনে নিয়েছিলো৷ সাধারন মানুষের ক্ষোভ সামাল দিতে খাদ্য দফতরের সচিবকেই বদলি করা হয়। কিন্তু তাতে অবস্থার কতখানি পরিবর্তন হলো ? আজও জেলায় জেলায় রেশন নিয়ে অভিযোগ ৷ তাহলে প্রমান হচ্ছে, বদলি হওয়া ওই সচিব-ই যে রেশন-কাণ্ডে একমাত্র দায়ী ছিলেন, কখনই এমন নয়৷
বিপর্যস্ত মানুষকে দুবেলা দুমুঠো অন্ন দেওয়া রাষ্ট্রের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। অথচ সরকারি রেশন ব্যবস্থা নিয়েই জেলায় জেলায় ডিলারদের বিরুদ্ধে এই মূহুর্তে অভিযোগের পাহাড়৷ ক্ষিপ্ত গ্রাহকদের বিক্ষোভ বেড়েই চলেছে। এই সংকটকালে গণবণ্টন ব্যবস্থা সুষ্ঠু রাখাই খাদ্য দফতরের কাছে সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ হওয়া উচিত৷ কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক, রাজ্যের খাদ্য দফতর সম্পূর্ণ ব্যর্থ৷ রাজ্যের অধিকাংশ জেলা থেকেই
রেশন নিয়ে বিক্ষোভের খবর পাওয়া যাচ্ছে৷ নিরাপদে ঘরে বসে টিভি ক্যামেরার সামনে সব দায় অস্বীকার করে, সব কিছু ঠিক আছে দাবি করে, এ সবই বিরোধীদের চক্রান্ত বলে উড়িয়ে দিয়ে দিনের পর দিন রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী যে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, তাতে মুখ্যমন্ত্রীরই অস্বস্তি বাড়ছে৷ কারন, বিরোধীদের অথবা রাজ্যপালের নিশানা হতে হচ্ছে মুখ্যমন্ত্রীকেই৷ কে খাদ্যমন্ত্রী, কে স্বাস্থ্য দফতরের রাষ্ট্রমন্ত্রী অথবা কে মুখ্যসচিব, কে-ই বা ডাঃ অভিজিৎ চৌধুরি, বিরোধীদের পাশাপাশি সাধারন মানুষও সে সব পাত্তা দেয়না৷ মুখ্যমন্ত্রীর একশো শতাংশ সদিচ্ছা এবং বেনজির পরিশ্রম ঢাকা পড়ছে কিছু লোকের চরম অযোগ্যতায়৷ সংকট বা সমস্যার সময়ই দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকা লোকজনের দক্ষতা ধরা যায়৷ এই সংকটকালে রাজ্যের বেশকিছু তথাকথিত “দায়িত্বশীল”, নিজেদের ব্যর্থতা উজাড় করে দিয়ে তোপের মুখে ফেলেছে খোদ মুখ্যমন্ত্রীকেই৷
মাথায় রাখা দরকার, আজ বা কাল এই করোনা বিদায় নেবেই৷ তারপর কোনও এক সময় রাজ্যে নির্বাচনও হবে৷ আজ যারা রেশন-কাণ্ডের জেরে দুমুঠো খাবার নিয়ে উৎকন্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন, ভোটের মুখে তাঁদের মনে আজকের করুন অভিজ্ঞতার স্মৃতি কেউ উসকে দিলে, শাসক দলের বিপদ বৃদ্ধিই পাবে৷
রেশন নিয়ে বিক্ষোভের আগুন ক্রমশ বাড়ছেই।
জরুরি ভিত্তিতে কড়া পদক্ষেপ করা দরকার সরকারের। অভিযোগ নানা ধরনের৷ কোথাও রেশন মিলছে না, কোথাও গ্রাহকদের মূল অভিযোগ, পরিমানে কম দিচ্ছে রেশন ডিলাররা। ওজনে কারচুপির অভিযোগও রয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। কোনও জেলায় অভিযোগ, চালের মান খুবই খারাপ৷ অভিযোগ এমনও আছে,রাজনৈতিক দলগুলির একাংশ কিছু ডিলারের কাছ থেকে জোর করে বস্তা বস্তা চাল সংগ্রহ করছে। ওদিকে, রেশন নিয়ে বিরোধীরা এই সময়েও নেমে পড়েছে রাজনীতি করতে৷
তাই, এই মুহূর্তে প্রশাসনকে রেশন ব্যবস্থা নিয়ে অভিযোগ কমাতেই হবে৷ কোনও দুর্নীতিই বরদাস্ত করা উচিত হবে না। করোনা আবহে রেশন ব্যবস্থা কড়া হাতে সামলানো দরকার সেক্ষেত্রে যদি ওই দফতরে ঢালাও রদবদল করতে হয়, সেটাই হোক৷ সংবাদ মাধ্যম খবর না করলেই যে রাজ্যে রেশন-ব্যবস্থা সুষ্ঠভাবে চলছে, এমন দাবি এখন আত্মঘাতী হবেই৷


























































































































