
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাজকর্মে ক্রমশই ক্ষোভ বাড়ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির৷ জাতীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রের খবর, শাহের ওপর মোদির এই হাড়ে চটার প্রধান কারন ট্রাম্পের ভারত সফরের সময়ই উত্তর-পূর্ব দিল্লির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক হিংসা৷ ট্রাম্প যখন ভারতে, তখনই দেশের রাজধানীতে ঘটে যাওয়া এই হিংসার ঘটনায় গোটা বিশ্বে ‘ফেস লস’ হয়েছে মোদির। আমেরিকার কাগজে বড় করে দিল্লি-হিংসার খবর ছাপা হয়েছে৷ এ সব কথা উল্লেখ করেই শাহকে নিজের ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন মোদি।
জানা গিয়েছে, যখন দিল্লির হিংসা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিলো, সে সময় প্রধানমন্ত্রী বার বার শাহকে সতর্ক করে দ্রুত ইতিবাচক ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন৷ কিন্তু শাহ কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ না করায়, ক্ষিপ্ত প্রধানমন্ত্রী নিজেই ফোন করে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালকে দিল্লির ঘটনাস্থলগুলিতে যেতে নির্দেশ দেন৷ শাহের আপত্তি সত্ত্বেও হিংসাকবলিত এলাকায় মোদির নির্দেশেই ছুটে যান অজিত ডোভাল। মোদি নিজে পরপর দু’দিন ডোভালকে পাঠিয়ে, পুলিশকে সক্রিয় করে, আধাসেনা মোতায়েন করে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এনে অমিত শাহর প্রতি অসন্তোষের বার্তাই দিয়েছেন মোদি।
দিল্লির হিংসা ঠেকাতে অমিত শাহের নিদারুণ ব্যর্থতার পর ঘনিষ্ঠ মহলে মোদি এতটাই বিরক্তি প্রকাশ করেছেন যে, শাহর পরিবর্তে অন্য কেউ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলে এতক্ষণে তাঁর মন্ত্রক কেড়ে নেওয়া হত। অমিত শাহের কার্যকলাপে মোদি তাঁর নিজের মর্যাদাহানির অভিযোগ পর্যন্ত এনেছেন৷ প্রধানমন্ত্রী- ঘনিষ্ঠ সূত্রের খবর, এত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা তাঁর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ইস্তফা দাবির ঘটনা মানতে পারছেন না মোদি৷ তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে রাষ্ট্রপতির কাছে পর্যন্ত স্মারকলিপি পেশ হয়েছে৷ এই ঘটনাকে নিজের অসম্মান হিসাবেই নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী৷ আর এই ঘটনার জন্য কংগ্রেস বা অন্যান্য বিরোধী দলকে অভিযুক্ত না করে, সরাসরি অমিত শাহের কার্যপদ্ধতিকেই দায়ি করেছেন প্রধানমন্ত্রী৷ বিষয়টি এতটাই গুরুতর আকার নিয়েছে যে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার হেভিওয়েট সদস্যরা এ নিয়ে মুখ খুলতেই চাইছেন না, আবার বিষয়টি উড়িয়েও দিতে পারছেন না৷ তবে এর মাঝেই মোদি-সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং নীতিন গড়কডি দলের অন্দরে অমিত শাহর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। রাজনাথ- গড়কডি এবং তাঁদের ঘনিষ্ঠ মহল শাহর ওপর বেদম চটে আছেন। পরিস্থিতি যেদিকে গড়িয়েছে তাতে, শাহ এখন মোদিজির কাছে শাঁখের করাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু যেহেতু জাতীয় রাজনৈতিক মহলে মোদি-শাহ ‘হরিহর-আত্মা’ হিসাবে পরিচিত, সে কারনেই মোদি এখনও পর্যন্ত নিজে মুখ না খুললেও ইতিমধ্যেই কড়া বার্তা দিয়েছেন অমিত শাহকে৷
এদিকে দলের অভ্যন্তরেও ঘুরিয়ে কঠোরভাবে সমালোচিত হচ্ছেন অমিত শাহ৷ সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
শাহকে কাঠগড়ায় না তুলে তাঁর মদতপুষ্টদের নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন দলের সাংসদ ও প্রাক্তন ক্রিকেটার গৌতম গম্ভীর। বিজেপির অভ্যন্তরীণ সমীকরণে গৌতম গম্ভীর নরেন্দ্র মোদির অনুগামী ৷ শাহ-ঘনিষ্ঠ বিতর্কিত বিজেপি নেতা কপিল মিশ্রর উসকানিমূলক মন্তব্যের নিন্দা করে গৌতম গম্ভীর প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘”যেই হোক, উসকানি দিলে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।” প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেত না থাকলে দিল্লির প্রথমবারের সাংসদ গৌতম গম্ভীরের সাহস হত না শাহের বিরুদ্ধে মুখ খোলার৷ মোদি-ঘনিষ্ঠ মহল প্রকাশ্যেই বলছেন, শাহ এবং তাঁর পুলিশ দিল্লি-পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হওয়ায় মোদি রীতিমতো ক্ষুব্ধ হয়েছেন৷ দিল্লি-হিংসার দ্বিতীয় দিন থেকেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিশিষ্ট নাগরিকরা পরের পর অভিযোগ জানিয়েছেন দিল্লি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে৷ দিল্লি পুলিশের পদস্থ কর্তাদের সামনেই একের পর এক হত্যার জোরালো সাবুদ মোদির কাছে পৌঁছে যাওয়ার পরই তিনি কার্যত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন৷ দিল্লি পুলিশ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক নিয়ন্ত্রণ করে৷ তাই শত অজুহাত দিলেও দিল্লি-হিংসার দায় অমিত শাহ কিছুতেই এড়াতে পারছেন না৷ অমিত শাহের দুই ‘স্নেহধন্য’, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুরের “ঐতিহাসিক” ‘গোলি মারো’ এবং সাংসদ প্রবেশ বর্মার ‘সরকারি জায়গায় মসজিদ ভেঙে দেওয়া’র মন্তব্য নিয়েও মোদি ক্ষোভ প্রকাশ করে শাহকে বলেছিলেন উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে৷ কিন্তু পরিকল্পিতভাবেই তা এড়িয়ে যান শাহ৷
শুধুই প্রশাসনিক ব্যর্থতাই অমিত শাহের বিরুদ্ধে একমাত্র অভিযোগ নয়৷ দলের সভাপতি থাকাকালীন অমিত শাহের একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তে, একক সিদ্ধান্তে সামগ্রিকভাবে বিজেপির অপূরনীয় ক্ষতি হয়েছে৷ নরেন্দ্র মোদির বিপুল জনপ্রিয়তায় কণামাত্র চিড় না ধরা সত্ত্বেও অমিত শাহের অপরিনত ভাবনাচিন্তায়
একের পর এক রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে হেরেছে বিজেপি৷ সেই পরাজয়ের বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়েছে দিল্লি বিধানসভা ভোটে মোট ৭০ আসনের মধ্যে বিজেপির মাত্র ৮ আসন পাওয়ার “কৃতিত্বে”৷
ফলে, শুধুই দিল্লি-হিংসার কারনেই নয়, দলের সভাপতি হিসাবেও অমিত শাহের সাংগঠনিক ব্যর্থতার কারনেও শাহের ওপর মোদির ভরসা ক্রমশই তলানিতে ঠেকছিলো৷ রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র ও ঝাড়খণ্ড হাতছাড়া হয়েছে শাহের আমলে। হরিয়ানায় জোড়াতালি দিয়ে সরকার গড়তে হয়েছে। এই তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন দিল্লি-ভোট৷
তবে রাজনৈতিক মহলের মতে, ফাটল চওড়া হলেও এখনই মোদি-শাহ জুটি ভেঙে যাবেনা৷ জোড়াতালি দিয়েই চলবে৷ না হলে শাহও ‘পাল্টা’ কিছু করার চেষ্টা করতে পারেন৷ তেমন হলে আরও ‘ভয়ঙ্কর’ বিপদে পড়তে পারেন দু’জনই৷ তাই চরম পথে হাঁটার সাহস কেউই আপাতত দেখাবেন না৷




























































































































