মমতাদির উপর ভরসা রেখেই অজানা সমুদ্রে ঝাঁপ দিলাম

0
20

পার্থ ভৌমিক

১ জানুয়ারি আমাদের তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা দিবস (foundation day), এই দিনটা আমাদের কাছে আবেগের, সম্মানের। প্রথম দিন থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) নেতৃত্বেই পথ চলেছি। মমতাদি তখন যুব কংগ্রেসের সভানেত্রী। আর আমি নৈহাটির যুব সভাপতি। সিপিএমের বিরুদ্ধে এককাট্টা লড়াই চলছে। আমাদের কর্মীরা মার খাচ্ছে, খুন হচ্ছে। তবুও সিপিএমের চোখে চোখ রেখে আমরা লড়াই করছি। কিন্তু মমতাদি বুঝতে পেরেছিলেন, কংগ্রেসে থেকে সিপিএমের বিরুদ্ধে বেশিদিন লড়াই করা যাবে না। তাই দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। সেটা ১৯৯৭-এর মার্চ মাস। বহুচর্চিত ইনডোর-আউটডোর মিটিংয়ের পর্ব পেরিয়ে এসে ১৯৯৮ সালের পয়লা জানুয়ারি জন্ম নিল তৃণমূল কংগ্রেস। এক নতুন লড়াই শুরু হল। যে লড়াইটা এতদিন পর্যন্ত কংগ্রেসে থেকে করতে পারছিলাম না, এবার খোলা মনে সিপিএমের বিরুদ্ধে আরও জোরদার ভাবে মাঠে নামলাম আমরা। সামনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৯৮ সালের লোকসভা নির্বাচনে আমরা বারাকপুরে হারলেও বাকি অনেকগুলো জায়গায় জিতেছিলাম। এরপর একের পর এক প্রতিকূলতা পেরিয়ে এসেছি। একটার পর একটা ইস্যু নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আন্দোলন আছড়ে পড়ল বাংলার বুকে। কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাপটে ভয় পেতে লাগল বামেরা। আরও তীব্র হল্ মার। খুন-জখম বেড়ে গেল। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম হওয়ার পরেই সিপিএম (CPIM) বুঝে গিয়েছিল এবার ওদের কপালে দুঃখ আছে। কারণ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাছোড়বান্দা। তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সিপিএমের বিরুদ্ধে। তাঁকেও আঘাত করা হয়েছে একাধিকবার। এমনকী মেরে ফেলার চক্রান্ত করা হয়েছে। প্রতিবারই কোনও না কোনওভাবে বেঁচে গিয়েছেন তিনি। এরপর একটার পর একটা নির্বাচন এসেছে। আমরা লড়াই করে গিয়েছি। কখনও হেরেছি, কখনও জিতেছে। একটা সময় বিরোধী দলের তকমা পেলাম। তখন বারাকপুর নৈহাটি অঞ্চলে সিপিএমের সে কী দাপট। তড়িৎ তোপদার ও তার গুন্ডাবাহিনী অত্যাচার করে বেড়াত বারাকপুর জুড়ে। আমরাও লড়াই দিতাম। আমরা আমাদের অনেক সহকর্মীকে হারিয়েছি। ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের গুলি চালানোর ঘটনার পর থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে প্রতিবছর ধর্মতলায় ওইদিন শহিদ দিবস পালন করা শুরু হয়। যা এখনও আমরা পালন করে চলেছি। কলকাতা অবরুদ্ধ হয়ে যেত মমতাদির ডাকে। এই বিশাল জনসভা থেকে তিনি আমাদের উদ্বুদ্ধ করতেন। আমরা নতুন লড়াইয়ের শক্তি পেতাম। সেই সময় বাংলার যেখানেই কোনও ঘটনা ঘটছে, অত্যাচার হচ্ছে, সেখানেই ছুটে যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আমাদের অঞ্চলে কতবার যে তিনি এসেছেন তার ইয়ত্তা নেই। তাঁর এই অদম্য জেদ, অসম সাহস, সিপিএমের বিরুদ্ধে একরোখা লড়াই আজ তৃণমূল কংগ্রেসকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। আমরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সংগঠন করতে করতে পথ চলেছি। যখন যে দায়িত্ব তিনি দিয়েছেন মাথা নিচু করে পালন করেছি। কারণ যেদিন তাঁকে ভরসা করে অজানা সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছিলাম, সেদিনও যে আস্থা ছিল আজও সেই আস্থা- ভরসা অটুট রয়েছে। যতদিন বাঁচব ততদিন তাই থাকবে। আজ আমার যেটুকু তা সবটাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য। তিনি কয়েকটা প্রজন্মকে তৈরি করে দিয়েছেন। সিপিএমের মতো বৃদ্ধতন্ত্রে বিশ্বাসী নন তিনি। তিনি তৃণমূলের রিজার্ভ বেঞ্চ তৈরি করে দিয়েছেন। হাতে ধরে নেতা-মন্ত্রী তৈরি করেছেন। কাজ শিখিয়েছেন। সাংগঠনিক এবং প্রশাসনিক দুই-ই। আমি বিধায়ক থেকে সাংসদ হয়েছি তাঁর আশীর্বাদে। বাংলাকে বদলে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আমাদের মতো প্রান্তিক ছেলেমেয়েদের সামনের সারিতে তুলে এনেছেন তিনি। কারণ, তিনি নিজে ছাত্র রাজনীতি করতে করতে উঠে এসেছেন। মাটির সঙ্গে তাঁর বরাবরের যোগ। বাংলার মানুষের পালস তিনি চোখ বন্ধ করে বুঝতে পারেন। আর পশ্চিমবঙ্গবাসীও তাঁর উপর আস্থা-ভরসা রাখে। কোনও বিভেদকামী শক্তি বাংলায় বিভাজন তৈরি করতে পারবে না। সম্প্রীতির বাংলায়, ঐক্যের বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এগিয়ে চলেছি আমরা। পাহাড় থেকে জঙ্গলমহল, গঙ্গাসাগর থেকে সুন্দরবন, বাংলার প্রতিটি ব্লকে অঞ্চলে আজ উন্নয়নের ছোঁয়া। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে সবুজসাথী সাইকেল, বার্ধক্যভাতা-এরকম প্রায় ৭৯টি প্রকল্প বাংলার মানুষকে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনা সত্ত্বেও একটি প্রকল্পও বন্ধ হতে দেননি তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার মানুষের পাহারাদার। গোটা জীবনটাই তিনি উৎসর্গ করেছেন মানুষের সেবায়।