লড়াই-সংগ্রামের আর এক নাম তৃণমূল কংগ্রেস

0
16

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়

১ জানুয়ারি ২০২৫ সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের ২৮তম প্রতিষ্ঠা দিবস (foundation day) অর্থাৎ ২৭ বছর অতিক্রম করে ২৮তম বর্ষে পদার্পণ করল।

আজকের প্রজন্ম সম্ভবত ভাবতেই পারবে না কী প্রবল সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমাদের সকলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) নিজের জীবন বিপন্ন করে পশ্চিমবাংলাকে মার্কসবাদী কমিউনিস্টদের সন্ত্রাস থেকে রক্ষা করেছেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ৮০-র দশক থেকে যে তীব্র লড়াই হয়েছিল তার সার্বিক বিবরণ আছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘উপলব্ধি’ বইতে।

যেহেতু সেই সময় কংগ্রেস দল দিল্লিতে ক্ষমতায় থাকার জন্য মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির (CPIM) সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিষয়ে বহুবার তাঁর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। কিন্তু কোনও ফল না হওয়ায় নতুন দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেন।

মানুষ এই অরাজক অবস্থার অবসান চায় কিন্তু দীর্ঘদিন বিরোধী দল তার প্রতি মর্যাদা দেখিয়ে সংগঠিত গণআন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি তৈরি হল তৃণমূল কংগ্রেস। নেতৃত্বে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নো আইডেন্টিটি কার্ড নো ভোট। নির্ভুল ভোটার তালিকায় ভোট করতে হবে, এই দাবিতে সোচ্চার হয়ে আন্দোলনে নামলেন। আজ বোঝা যাচ্ছে সেদিন নির্ভুল ছিল তাঁর দাবি তাই নির্বাচন কমিশনও বলছে যে প্রতিটি ভোটারের ছবি-সহ ভোটার তালিকা এবং আই কার্ড থাকতেই হবে। তারপর টাডা আইনের বিরুদ্ধে, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে, শিক্ষা ব্যবস্থাকে সংকীর্ণ রাজনীতি-মুক্ত করার জন্য, বন্ধ কারখানা খোলার দাবিতে, সালিশি বিল প্রত্যাহারের দাবিতে এবং প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজি পড়ানোর দাবিতে লড়াই করেছেন। লড়াই করেছেন সংখ্যালঘু ও তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের অধিকার রক্ষার জন্য। ১৯৯৮ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ লড়াই আস্তে আস্তে মানুষের মনে বিশ্বাস তৈরি করেছেন। ফলে সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, পুরুষোত্তমপুর-সহ বিভিন্ন জায়গায় কৃষক আন্দোলন এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। আন্দোলন এতটাই সঠিক ও তীব্রতা অর্জন করেছিল যে সমগ্র পৃথিবীর মানুষ কৌতূহলী হয়ে পড়েছিল। বাংলার বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক-সহ সমগ্র জানান। অবশেষে কেন্দ্রীয় সরকার জমি অধিগ্রহণ আইন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, ২০০৯- ১০ এর বাজেটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি মেনে পশ্চিম বাংলা সরকার অকৃষি ও কর্ম উৎপাদন করে এমন জমি কিনে ল্যান্ড ব্যাঙ্ক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই আন্দোলনের মধ্যেই লেখা হয়েছে নতুন ইতিহাস। ছাব্বিশ দিনের অনশন, সুশীল সমাজের লক্ষাধিক মানুষের মিছিল রাজ্যের মানুষকে এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, অপদার্থতা, স্বজনপোষণ ও রাজনৈতিক দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছে। ১৯৯৭ সালের ২২ ডিসেম্বর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বাড়িতে সাংবাদিক সম্মেলনের ডাক দেন। সেই সম্মেলনেই তিনি ঘোষণা করেন, নতুন দল গঠন করবেন। সন্ধ্যায় তৎকালীন প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দল থেকে চিরকালের জন্য বহিষ্কার করেন এবং সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আমাকে ৬ বছরের জন্য বহিষ্কার করেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুক্তমনে ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি নতুন দল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের কথা ঘোষণা করেন দিল্লি থেকে। নির্বাচন কমিশনে করা আবেদনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (সাংসদ), অজিত পাঁজা (সাংসদ) (Ajit Panja) এবং কৃষ্ণা বসু (সাংসদ)-র (Krishna Basu) স্বাক্ষর ছিল। এরপর যাত্রাপথ আরও কঠিন হল। নতুন দল গঠনের পর মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি রাজ্য জুড়ে ব্যাপক অত্যাচার শুরু করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবাংলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে গিয়েছেন যখনই সন্ত্রাস-খুন-অগ্নিসংযোগ হয়েছে।

দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে অনুন্নয়ন ও অত্যাচার সহ্য করেছে পশ্চিমবাংলার মানুষ কিন্তু পরিবর্তন করে কার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস জানাবে তার সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। ২০১১ সালে পশ্চিমবাংলার মানুষ সিদ্ধান্ত নিল যে একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই পারবেন পশ্চিমবাংলার হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে। ২০১১ সালে পশ্চিমবাংলায় তৃণমূল কংগ্রেস বামফ্রন্টকে পরাজিত করে শাসন ক্ষমতায় আসে। সহযোগী দল ছিল জাতীয় কংগ্রেস (INC)। নতুন যাত্রা শুরু করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর জনমুখী প্রকল্প ও পশ্চিমবাংলার সর্বস্তরের মানুষের জন্য উন্নয়নের কাজ করার ফলস্বরূপ ২০১৬ এবং ২০২১ সালেও পশ্চিমবাংলার মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করে। ২০১১ সাল থেকে পশ্চিমবাংলাকে ভারতের শ্রেষ্ঠ রাজ্যরূপে প্রতিষ্ঠিত করার যজ্ঞে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।