পিকে-কে নামিয়ে সঠিক কাজ করেছেন মমতা-অভিষেক

0
20

গত ক’দিন আগে একটি আড্ডায় জমজমাট রাজনৈতিক আলোচনা চলছিল, তৃণমূলে নেতাকর্মীরা ডোবাচ্ছেন আর একা পিকে বাঁচাচ্ছেন; এই ধারণা বাড়তে দেওয়া দলের পক্ষে কতটা ঠিক?

ঘটনাচক্রে সেইসময়ই ‘দৃষ্টান্ত’ পত্রিকার সম্পাদক জিষ্ণু চট্টোপাধ্যায় প্রশান্ত কিশোরকে নিয়ে এই ধরণেরই একটি বিষয়ে লিখতে বলায় আমি লিখে পাঠাই। সেই সংখ্যাটি প্রকাশের মুখে।

কিন্তু সোমবার নেতাজি ইন্ডোরে তৃণমূলের সম্মেলনটি দেখে মনে হল, আমার সেই লেখার সম্পূর্ণতার জন্য আরও কিছু দরকার ছিল।

এতদিন শুনেছি। পড়েছি। টিভির কথা শুনেছি। সোমবার গোটাটা চোখে দেখা।
প্রশান্ত কিশোর ঠিক কী করছেন, কীভাবে করছেন এবং তৃণমূলে তার সুফল কীভাবে আসতে পারে, দেখলাম।
এর দুটো দিক।
এক, বাহ্যিক। অর্থাৎ কর্পোরেট স্টাইলে দলের সম্মেলন।
দুই, দলের অভ্যন্তরিন গুণগত মান পরিবর্তনের জন্য ওষুধ।

এই দুটোই আমার কাছে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও ইতিবাচক বলে মনে হয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো দলের শীর্ষে আছেনই; অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা করতেই হয় নিজে প্রচারের বাইরে থেকে টিম পিকে-কে এইভাবে কাজে লাগানোর জন্যে।

একটা প্রশ্ন ছিলই। বা কিছু লোকের মধ্যে আছেও।
তৃণমূলের তো এতদিন এত সাফল্য, দুরন্ত ফাইট ব্যাক, পরিবর্তনের আন্দোলনের জয় এসেছে।
কই, পিকে-কে লাগে নি তো?
তাহলে হঠাৎ কী হল, যে চারপাশে রব উঠছে, পিকেই দলটাকে বাঁচাচ্ছেন? বা পিকের ওষুধে দল চলছে?

সোমবার গোটা বিশ্লেষণটা করলাম।
দেখলাম, জিষ্ণুবাবুর পত্রিকার জন্য কদিন আগে যে লেখাটি পাঠিয়েছি, তার অভিমুখ ঠিকই।

দলকে বিরোধী থেকে শাসক করা কঠিন। খুব কঠিন। আর শাসক থাকাকালীন দলের শরীরস্বাস্থ্য ঠিক রাখাটাও কম কঠিন নয়। আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রে শাসকের দেহে অবাঞ্ছিত মেদ জমে, যা তার গতি কমিয়ে দেয়। বামফ্রন্টও যে অসুখ থেকে বেরোতে পারে নি।

তৃণমূল এখন থেকেই মেদ ঝরাতে চাইছে। যোগব্যায়াম, জিম করতে চাইছে। আর এই দাওয়াইটা পিকে দিচ্ছেন। লোকসভায় খানিকটা ধাক্কার পর “দিদিকে বলো” ঘিরে দল রাস্তায় নেমেছে, সুফল মিলেছে। এখন যে “বাংলার গর্ব মমতা” কর্মসূচি দেওয়া হল, তার যা যা পর্যায়, তাতে 294 বিধানসভা কেন্দ্রজুড়ে নিবিড় বিজ্ঞানভিত্তিক জনসংযোগ। গোটা তালিকাটা চমকে দেওয়ার মত। এভাবে এগোলে দলের শরীরস্বাস্থ্য চাঙ্গা থাকতে বাধ্য।

এবং মনিটরিং। নেত্রীর ভাষণেই স্পষ্ট, তিনি নেতাদের গোষ্ঠীবাজির ঊর্ধ্বে উঠতে বলছেন। দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে চাইছেন। কর্মসূচি রূপায়ণে যাতে সকলকে নামানো যায়, তাতে নেতাদের পাশাপাশি পিকের মনিটরিং অনেকটাই বেশি কার্যকর হচ্ছে। সঠিক নিরপেক্ষ রিপোর্ট আসছে। চাপ থাকছে। দলের মধ্যে গাছাড়া বা বেপরোয়া ভাবটা কেটে যাচ্ছে। এক অদৃশ্য শক্তির নজরদারি সক্রিয়তা বাড়াতে বাধ্য করছে।

এটা পিকের সুফল।
দলের মূল কাঠামোর পাশাপাশি এই টিম পিকের সমান্তরাল কাঠামোটা এখানেই কার্যকর হচ্ছে।

সাধারণভাবে তৃণমূলের মুখ দলনেত্রী নিজে এবং মূল সম্পদ আবেগ।
অভিষেক তার সঙ্গে সাংগঠনিক অনুশাসন, শৃঙ্খলা, কাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি, আধুনিক ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি যোগ করতে চাইছেন। এখানে তাঁর অস্ত্র প্রশান্ত কিশোর।

আগে তৃণমূলের সাফল্যের জন্য পিকে-কে দরকার হয় নি, একদম ঠিক।
আবার এখন, এই ক্ষমতাসীন তৃণমূলের শরীর সুস্থ রাখতে পিকের দাওয়াইগুলি প্রাসঙ্গিক ও জরুরি, সেটাও ঠিক।

মমতা আছেন মমতার উচ্চতাতেই। তিনিই শেষ কথা। অভিষেক বাস্তবসম্মত রণকৌশলে হাল ধরছেন। দলের জেলাভিত্তিক হালহকিকত তাঁরা জানেন। আর তাঁরা পিকের পরামর্শ ও রূপায়ণকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাচ্ছেন। এটাই বাস্তব। বড় পরীক্ষার আগে কখনও কখনও দক্ষ প্রাইভেট টিউটর লাগে। বড় খেলার আগে নামি কোচ বা টেকনিকাল ডিরেক্টরের গুরুত্ব বাড়ে। নেত্রী বা অভিষেক সঠিক সময়ে এমন একজন কোচের পরামর্শ নিয়ে দলকে সুস্থ, গতিশীল রাখতে চেষ্টা করছেন। চেষ্টা সঠিক। ফলাফল সময় বলবে।